Bangla Blog on Rituparno

আপনি যে মোবাইল নম্বরটিতে কল করছেন সেটা বর্তমানে সুইচড অফ করা আছে। দয়া করে কিছুক্ষণ পরে আবার ট্রাই করুন… খুব পরিচিত এবং অবশ্যই বিরক্তিকর (মাঝে মাঝে উদ্বেগজনক) একটি বাক্য! মুম্বইতে আবার সুইচড অফ‌-এর একটা অন্য মানে আছে। এখানে কেউ মারা গেলে তাঁকে ‘অফ’ বলে চিহ্নিত করা হয়। যেমন ধরুন রাম, শ্যাম, যদু, মধু কেউ মারা গিয়েছেন, মুম্বইতে বলা হবে রাম অফ হয়ে গিয়েছে! বোঝো কাণ্ড!

তবে মুম্বইতে কে কী ভাবে এই অফ শব্দটি ব্যবহার করে থাকে তা নিয়ে গল্পগাছা করতে বসিনি। আজ কম্পিউটরের সাদা স্ক্রিনে যে মোবাইল ফোন সুইচ অফ করার কথা লিখব বলে বসেছি, সেই মোবাইলটি আমার জ্ঞানত, কোনও দিনই সুইচড অফ থাকেনি। সেই ফোনটা আর কারও নয়, ঋতুপর্ণ ঘোষের। কাউকে কিছু না জানিয়েই হুট করে ফোন সুইচড অফ করে দিয়ে একেবারে আউট অফ রিচ হয়ে গেলেন! মেমরিজ ইন মার্চ ছবিটির কথা মনে পড়ে? যখন সিদ্ধার্থের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে অর্ণব (ঋতুপর্ণ ঘোষ) সিদ্ধার্থের মাকে তা দেখাচ্ছে? মানুষটা চলে গিয়েছে, কিন্তু ভার্চুয়াল দুনিয়ায় সে তখনও ভীষণ ভাবে জীবন্ত। চিত্রনাট্যের সঙ্গে ঋতুপর্ণর বাস্তব জীবনটা কি অদ্ভুতভাবে মিলে গেল!

দুর্বোধ্য আর্ট ফিল্মমেকারের তকমা কোনও দিনই নিজের গায়ে লাগতে দেননি তিনি। তাই হয়তো তাঁর সিনেমা সবাই ভালোবেসেছে, টিকিট কেটে হলে দেখতে গিয়েছে, আলোচনা করেছে, সমালোচনা করতেও ছাড়েনি। কিন্তু আর যাই হোক আর্ট ফিল্ম বলে নাক সিঁটকে দূরে সরে যাননি দর্শক। কিন্তু মানুষ ঋতুপর্ণ, ব্যক্তি ঋতুপর্ণকে কত জন বুঝতে পেরেছে (আদৌ কি কোনও দিনও বোঝার চেষ্টা করেছে কেউ!)! এখন যখন হুট করে ঋতুপর্ণ সবার নাগালের বাইরে চলে গিয়েছেন, সবাই হঠাত্‍‌ করে তাঁর সম্পর্কে সচেতন হয়ে পড়েছেন। তাঁর শিল্পী সত্তার প্রশংসায় সবাই মুখর হয়ে উঠেছেন… (এঁদের মধ্যে হয়তো এমন অনেকেই আছে, যাঁরা বেশিরভাগ সময়ে ঋতুপর্ণর ছবি দেখেছেন শুধুমাত্র খুঁত ধরার জন্যে!), আজ আর আমি সেই কাটাছেঁড়াতেও যেতে চাইছি না… আজ পরিচালক ঋতুপর্ণকে না হয় ছুটিই দিলাম…. আজ কথা বলব সেই ঋতুপর্ণকে নিয়ে যাকে আমি চিনতাম ঋতুদা বলে। ব্যক্তি ঋতুদা…বা হয়তো সেই বিশেষ মানুষের খোঁজে যে জীবনটা কাটিয়ে দিলেন, সেই ঋতুদা আজ আমার মন মেজাজ ছেয়ে রয়েছেন।

এতদিন বলিউডের অলিগলি ঘুরতে ঘুরতে একটা সত্যি আবিষ্কার করেছি… এখানে বেশিরভাগ অভিনেতা ও পরিচালকদের দু’ভাগে ভাগ করা যায়। এক- যাঁরা মিথ্যে বলেন আর দুই- যাঁরা মিথ্যে দুনিয়ায় বেঁচে আছেন। বিশেষ করে নিজেদের সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনের ক্ষেত্রে এঁরা এক মিথ্যের আড়ালে নিজেদেরকে ঢেকে রাখেন। সেলেবরা তাঁদের সেক্সুয়ালিটি নিয়ে কখনও খুল্লমখুল্লা কথা বলবেন না। সমকামী হওয়া সত্ত্বেও কখনও স্বীকার করবেন না যে তাঁরা গে! কারণ তাতে তাঁদের সোশাল প্রেস্টিজে চিড় ধরতে পারে! তবে এমন কিছু বন্ধুবান্ধবও আছেন যাঁরা সগর্বে ঘোষণা করেন যে তাঁরা গে! কারণ সেলেবদের মতো মিথ্যে সোশাল প্রেস্টিজের ধ্বজা ওড়ানোর তাড়না তাদের মধ্যে নেই।

ফিরে আসি ঋতুদার কথায়। আমার মতো যাঁরা সাংবাদিক তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই জানেন ঋতুপর্ণ ঘোষ কতটা মুডি মানুষ ছিলেন। শরতের আকাশের মতোই হুটপাট করে বদলে যেত তাঁর মন মেজাজ। আর একবার যদি তাঁর মনে হত যে কোনও সাংবাদিক তাঁকে বেঠিক কোনও প্রশ্ন করবেন তাহলে মেজাজ হয়ে যেত আরও তিরিক্ষি! যদিও আমি তেমন প্রশ্ন কোনওদিনও করিনি, তবে মাঝেমধ্যেই ঋতুদার কাছ থেকে এমন টেঁরাবেঁকা উত্তর পেতাম যে, মনে মনে ভাবতাম, যাঃ এবার বোধহয় ইন্টারভিউটাই কেঁচে গেল। তবে যাই হোক না কেন, ঋতুদার ফোনে কল করে সেটা সুইচড অফ পাব এমন ঘটনা কোনওদিনই ঘটেনি। বেশিরভাগ সময়েই ফোন করলে ওপ্রান্ত থেকে ভেসে আসত ঋতুদার আওয়াজ। মাঝে মাঝে যখন ফোন ধরতেন না, তখন এসএমএস-এ উত্তর দিতেন। বেশিরভাগ সাংবাদিকই তাঁর চোখের বালি ছিল, আর বলতে কোনও দ্বিধা নেই যে সেই লিস্টে আমার নামটিও ছিল। সব জানা সত্ত্বেও কোনও দিনও ভাবিনি যে ৯৮৩০০৫৬*** নম্বর ডায়াল করলে কেউ ফোন ধরবে না বা অন্তত এসএমএস-এ একটা রিপ্লাই দেবে না! সুইচড অফ! নামুমকিন!

এই প্রতিবেদনটি লিখতে লিখতেই কী খেয়াল হল একবার ডায়াল করলাম ঋতুদার নম্বরে। ওপ্রান্ত থেকে বিচ্ছিরি যান্ত্রিক গলায় একজন বললেন…আপনি যে মোবাইল নম্বরটিতে কল করছেন সেটা বর্তমানে সুইচড অফ করা আছে। দয়া করে কিছুক্ষণ পরে আবার ট্রাই করুন!! সত্যিই ঋতুদা এখন ত্রিসীমানার বাইরে!

কেন এত রাগ জমা হয়েছিল তাঁর মনে?

মুম্বইয়ের সাংবাদিকদের উপর একটা অদ্ভুত রাগ ছিল ঋতুদার। আর সেটা তিনি তাদের মুখের ওপরেই বলে দিতেন। কোনও দিনও পাশ কাটিয়েও চলে যাননি। দ্বিধা ছিল না তাঁর বিরক্তি ও রাগ প্রকাশ করাতে। আর এই রাগের কারণ একদিকে যেমন তাঁর ছবির প্রতি মুম্বইয়ের সাংবাদিকদের অকারণ উন্নাসিকতা, তার থেকেও বড় কারণ তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ( তাঁর সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন) সম্পর্কে কিছু সাংবাদিকের অত্যুত্‍‌সাহ। যদিও আমি এই কোনও দলেই কোনও দিন পড়িনি, তবুও আমার প্রতিও চিরকালই বিরূপ ছিলেন তিনি।

soumyadipta-2.jpg

মনে আছে একবার মুম্বই ফিল্ম ফেস্টিভালে রাইমার সঙ্গে একটি ছবির প্রচারে এসেছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। কো-অর্ডিনেটর তাঁর সঙ্গে ইন্টারভিউ আগাম ফিক্স করে রেখেছেন। ফলে খুব একটা ইচ্ছে না থাকলেও গেলাম, কারণ ফ্লাইট ধরার আগে একমাত্র আমার সঙ্গে নাকি তিনি কথা বলবেন। কোনও আশা ছাড়াই ঋতুদার মুখোমুখি গিয়ে বসলাম। দু’জনের কেউই খুব একটা খুশি নই, একে অপরের সামনাসামনি বসে। সেই দিনের আলাপচারিতাই আজ তুলে ধরলাম এখানে—

আমি: আপনি রাইমাকে নিজের মতো করে তৈরি করে নেওয়ার কথা বলছিলেন….
ঋতুদা: (মাঝপথেই আমাকে থামিয়ে দিয়ে) আমি এখানে রাইমাকে নিয়ে কথা বলতে আসিনি। এসেছি ছবির প্রচারে… বেশি চালাকি করার চেষ্টা কোরো না। ছবিতে রাইমার চরিত্র সম্পর্কে কথা বলার জন্যেই আমার এখানে আসা। সে বিষয়েই প্রশ্ন করো।
আমি: ধন্যবাদ
ঋতুদা: কীসের জন্যে ধন্যবাদ?
আমি: এই যে আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন, তাই ধন্যবাদ জানালাম।
ঋতুদা: কিন্তু আমি তো তোমার কোনও প্রশ্নের উত্তর দিইনি!
আমি: একদম ঠিক, কোনও উত্তর না দিয়েই আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়েছেন।
ঋতুদা: তা আমার উত্তরটা কী?
আমি: আপনার উত্তর হল যে আপনি এখানে ছবির প্রচারে এসেছেন আর তার বাইরে আপনি কিছুই বলবেন না। আপনার কিছু যায় আসে না আমি আপনাকে কী প্রশ্ন করলাম!
ঋতুদা: হ্যাঁ, এটাই আমার উত্তর।
আমি: তাই আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানালাম। কারণ ছবি সম্পর্কে কোনও কথা বলতে আবার আমি একেবারেই ইচ্ছুক নই! আমি এখানে ব্যক্তি ঋতুপর্ণের সঙ্গে কথা বলতে এসেছি, আপনার ছবি প্রোমোট করতে নয়। এখানেই আমাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। তাই আমার মনে হয় আমাদের সেদিনই কথা বলা উচিত যেদিন কোথাও না কোথাও দুজনের ইন্টারেস্টের মিল থাকবে। ধন্যবাদ আমার সঙ্গে কথা বলার জন্যে।

বেশ কিছুক্ষণের স্বব্ধতা…

ঋতুদা: কী জিজ্ঞাসা করতে চাও আমাকে?
আমি: আপনার ছবির সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই।
ঋতুদা: ঠিক আছে, কিন্তু কী জিজ্ঞাসা করতে চাও তুমি?
আমি: আপনি সব সময়ে এত রেগে থাকেন কেন? কোন জিনিসটা আপনাকে এত বিব্রত করে? কেন আপনার সব সময়ে মনে হয় আমার মতো মানুষজন আপনাকে আঘাত করবে?
ঋতুদা: তুমি কি অন রেকর্ড আমাকে জিজ্ঞাসা করছো?
আমি: এটা কোনও সাক্ষাত্‍‌কার নয়, আমি এ নিয়ে কিছু লিখবও না। আমি শুধুই আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি। খুব জানতে ইচ্ছে করে কোনও কারণ ছাড়াই আপনি কেন এমন রেগে থাকেন? কেন আপনার সব সময়ে মনে হয় যে একটা কাল্পনিক খারাপ জায়গায় আপনি বাস করছেন, এবং সবাই আপনাকে যন্ত্রণা, কষ্ট দেবে?

আবার বেশ কিছুক্ষণের স্বব্ধতা…

আমি কি খুব ভুল? আমি ছবি বানাই…কিন্তু তোমরা আমার ছবি নিয়ে কথা বলো না, বলো আমার ম্যানারিজম নিয়ে। মুম্বইতে কোনও বিয়ে বাড়িতে এলে গুনগুন শুরু হয়ে যায়, ঋতুপর্ণ কি ব্রেস্ট অগমেন্টেশন করিয়েছে! কোনও ইন্টারভিউতে গেলে প্রশ্ন আসে এখন কোন পুরুষ আমার শয্যসঙ্গী! অন্য কোনও পরিচালককে এমন প্রশ্ন করা হয় কি? যদি কোনও হোমোফোবিক সাংবাদিক আমার সেক্সুয়ালিটির জন্যে অথবা আমার ম্যানারিজমের জন্যে আমার নামে কুত্‍‌সা ছড়ায় তাতে রাগ হবে না! এই ফোরামে যত পরিচালক এসেছে তাঁদের সবার থেকে বেশি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড আমি পেয়েছি…কিন্তু সবার নজর আমার ব্রেস্টে গিয়েই আটকে যায়। আমার ছবির সঙ্গে সেক্সুয়ালিটির সম্পর্কটা কোথায় সেটা বলতে পারো? একজন পুরুষকে ভালোবাসার মধ্যে দোষটা কোথায়? কোনও কোনও সাংবাদিক চিপ পাব্লিসিটির জন্যে আমার সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনকে ব্যবহার করেন। কিন্তু আমি এটা কোনওদিনই মেনে নেব না। আমার সেক্সুয়ালিটি নিয়ে কারও কোনও আপত্তি থাকলে সেটা তার সমস্যা, আমার নয়। আমি কী সেটা আমি খুব ভালো ভাবে জানি। আমাকে নতুন করে কেউ কিছু শেখাতে আসলে আমি সেটা কখনওই মেনে নেব না। কোনও গে মার্কিন পরিচালককে কি এমন প্রশ্ন করবে কেউ? লজ্জা করে না তোমাদের!

কিছুক্ষণ থেমে…

আমি তোমার কথা বলছি না, আমি জানি তুমি এমন লেখোনি, কিন্তু ঠিক এমনই লেখা এখানে হয়েছে। দেখো, একদিন আমি সমকামিতা
নিয়ে ছবি বানাবই!!

সেই তাঁর সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাত্‍‌কার। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইন্টারভিউ শেষ হয়ে যায়। আমি বেরিয়ে আসি ঘর থেকে… বেরিয়ে এসে একটা কথাই মনে হয়েছিল…. ঋতুদার এমন ক্ষমতা আছে যা আর কারও নেই। তাঁর সাহসকে কুর্নিশ জানাতেই হয়। হ্যাঁ, তিনি রেগে ছিলেন। রেগে থাকাটাই স্বাভাবিক… শুধু ঋতুদা কেন? তাঁর মতো আরও কত মানুষ আমাদের উপরে রেগে আছেন!

কিন্তু আমাদের কোনও লজ্জা নেই। তাঁদের নিয়ে হাসিঠাট্টা করার বারোয়ারি অভ্যেসে দাঁড়ি-কমা বসাতেও আমরা এখনও শিখলাম না!!

Original link of the blog

1 reply »

Let us know whether you liked the post or not

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s