মান্যাকে ঠিক চিনেছিলেন ঋতু

মোর লাগি করিয়ো না শোক-
আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই-
শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঠিক ঠাওর করতে পারছেন না তো! ভাবছেন খাঁটি বলিউডি সাংবাদিকের মুখে আবার রবি ঠাকুরের পদ্য কেন! কোনও সিনেমার গানের কলি হলে অথবা হালফিলের সিনেমায় ব্যবহার করা শায়েরি-র ভগ্নাংশ দিয়ে শুরু করলে এই হোঁচটটা খেতেন না বলুন?

কিন্তু আজ রবি ঠাকুর না আউরে পারলাম না… তবে এই ভূমিকার সূত্র রয়েছে বলিউডের অন্দরেই। বলা ভালো, বলিউডের এক নায়িকার তীব্র লড়াইয়ের পরতে পরতে।

অনেকবার অনেক ভাবে শুনেছি রবীন্দ্রনাথের কাছে পাওয়া যায় চিরকাঙ্ক্ষিত শান্তির আশ্রয়। সেই দাবি আরও একবার সত্যি হতে দেখলাম… পুরোটা বুঝতে না পারলেও খানিকটা বোঝার চেষ্টা করলাম… আর সেটা পারলাম মণীষা কৈরালার জন্যে।

manisha.jpg

জীবনের এক কঠিন সময়ে মণীষাকে আগলে রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবি ঠাকুর মান্যাকে (চেনাপরিচিতেরা এই নামেই তাঁকে ডাকেন) হাসিয়েছেন, তাঁকে সাহস জুগিয়েছেন, পরম যত্নে হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন অগ্নিপরীক্ষার মধ্যে দিয়ে। আমার কথা না, এমনটাই একটি সাক্ষাত্‍‌কারে মণীষা বলেছিলেন। বান্ধবহীন নিউ ইয়র্কে চিকিত্‍সাধীন থাকাকালীন তিনি বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের কবিতা আমি ভালোবাসি। তাঁর কবিতা আমাকে সাহস জোগায়… তাঁর কবিতা আবৃত্তি করে আমি শান্তি পাই।’

 

ক্যানসার ধরা পড়ার পর এমন অনেক দিন গেছে যখন তীব্র যন্ত্রাণায় সময় কাটিয়েছেন… কেমোথেরাপি শুরু হওয়ার পর মন আর মেজাজের মধ্যে হামেশাই তালমিলের চূড়ান্ত অভাব দেখা দিত… অবসাদ কখনও কখনও নিঃশব্দে হাত বাড়াত। আর তার সঙ্গে যেন যোগ্য সঙ্গত দিত নিউ ইয়র্কের মেঘলা আকাশের তীব্র বিষন্নতা। কিন্তু মাথা নীচু করে অবসাদ, যন্ত্রণার কাছে হার মানবার পাত্রী তো মনীষা একেবারেই না।

 

যখন তামাম বলিউডে ছড়িয়ে পড়ল মণীষার ক্যানসারের খবর, তখন বলিউড ছেড়ে ফোন লাগিয়েছিলাম ঋতুপর্ণ ঘোষকে… হঠাত্‍‌ তিনি কেন? কারণ শুধুমাত্র তাঁর ছবিতে (খেলা) অভিনয়ই করেননি মনীষা, ঋতুপর্ণের খুব ঘনিষ্ঠদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তিনি। তো সেদিন মনীষার প্রসঙ্গ উঠতেই ঋতুদা বলে উঠলেন, ‘মান্যাকে তুমি চেনো না। তুমি যদি মনে করে থাকো যে মার্কিন মুলুকে যাওয়ার সময় প্লেনে বসে ও কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছে, তাহলে খুব ভুল ভাবছ। ওর মধ্যে এতটা জীবনীশক্তি আছে যে অন্য কারও সমবেদনার প্রয়োজন অন্তত ওর নেই। ও নিজেই নিজের খেয়াল খুব ভালোভাবে রাখতে পারে।’ এই কথাগুলো এখনও আমার কানে বাজে… কী ভীষণ প্রত্যয়ের সঙ্গে সেদিন তিনি বলেছিলেন যে হেরে যাওয়ার পাত্রী মণীষা নন। আজ যখন তাঁর সেই বিশ্বাসকে সত্যি করে, মৃত্যুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঝকঝকে মনীষা ফিরে এলেন ঘরে, সেদিন আর শুভেচ্ছা জানানোর জন্যে থাকলেন না তাঁর পরম বন্ধু ঋতুপর্ণ! তিনি যে এখন অন্য কোনও ছবি তৈরিতে ব্যস্ত! তবে এখনই বোধহয় সেই সব ছবিতে মনীষাকে কাস্ট করতে তিনি চান না…

 

ফিরে আসার পর অনেক কষ্ট করে তাঁকে ফোনে ধরতে পেরেছিলাম। খুশিতে উচ্ছ্বল মনীষা এক দমে বলে গেলেন কী ভীষণ খুশি তিনি বাড়ি ফিরে এসে। কাঠমাণ্ডুর থেকে মুম্বই তাঁর কাছে কোনও অংশেই যে কম নয়! কথার মাঝে আস্তে আস্তে আগল খুলল মনের… খোলা খাতার মতোই মেলে ধরলেন সেই সব দিনের অভিজ্ঞতা যখন তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে কাটিয়েছেন দিনগুলো… যখন কেমোথেরাপির জন্যে আস্তে আস্তে মাথার সব চুল উঠে যেতে থাকল, শরীরে দেখা দিতে লাগল নানা পরিবর্তন, তখন কীভাবে তাঁর পরিবার এবং কয়েকজন বিশেষ বন্ধু পাশে থেকেছিলেন… বললেন কীভাবে শিল্পপতি সুব্রত রায় নিউ ইয়র্কে থাকার জন্যে বিশেষ ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন তাঁর জন্যে… কীভাবে দিনের পর দিন কোনও প্রত্যাশা ছাড়াই প্রাণের বন্ধু দীপ্তি নাভাল তাঁর পাশে থেকেছেন।

manisha%202.jpg

শুধু দীপ্তি, সুব্রত রায় অথবা পরিবারের লোকজনই নন, তাঁর পাশে সব সময় হাজির ছিলেন তাঁর বাঙালি ম্যানেজার সুব্রত ঘোষ। হাজার কঠিন সময়েও তাঁকে ছেড়ে অন্যত্র চাকরির সন্ধানে চলে যাননি তিনি। আর মনীষা ফিরে আসাতে তাঁর থেকে বেশি খুশি বোধহয় আর কেউ হননি… ম্যাডাম যে আবার ক্যামেরার মুখোমুখি হতে পারবেন! এর থেকে বড় পাওনা আর কী-ই বা হতে পারে!! কথা প্রসঙ্গে উঠল তাঁর স্বামীর কথাও, যিনি এই দুঃসময়ে তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন!

 

তাঁর কাছের এক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কেমন ছিল হাসপাতালের সেই দিনগুলি… কই কেউ তো খোঁজ নিত না… মনীষার পরিবার আর দীপ্তি ছাড়া কেউ তো পাশে এসে বসত না! মাঝেমধ্যে জ্যাকি শ্রফ, ঊর্মিলা মাতোন্দকার, গুলশন গ্রোভার ফোন করতেন, কিন্তু ওই পর্যন্ত… মাঝেসাঝে অবশ্য ফেসবুকে তথাকথিত শুভাকাঙ্ক্ষীরা বার্তা পাঠাতেন… আর সব থেকে আশ্চর্যের ব্যাপার হল প্রায় সবাইকেই হাসিমুখে উত্তর দিতেন মনীষা। সত্যি কথা বলতে কী সম্পূর্ণ একা মৃত্যুর সঙ্গে দাবা খেলে, শেষ চালে মৃত্যুকে চেক মেট করে হাসি মুখে ফিরে এসেছেন মনীষা(কিছুদিনের মধ্যেই তিনি আরও একবার মার্কিন মুলুকে পাড়ি দেবেন ফলো-আপ ট্রিটমেন্টের জন্যে)।

 

নিউ ইয়র্ক থেকে ফেরার সময়ে ফ্লাইটে তাঁর যাত্রাসঙ্গী ছিলেন হৃত্বিক রোশন। ফিরে এসে তিনি বলেছিলেন যে, ‘মনীষা এক জন সত্যিকারের যোদ্ধা। তাঁর সৌন্দর্য আমাকে অবাক করেছে। এত উজ্জ্বল ও উচ্ছ্বল তিনি!’ প্রসঙ্গত মনীষা ও হৃত্বিকের মধ্যে পরিচয় দীর্ঘদিনের কারণ তাঁরা দুজনে একই আধ্যাত্মিক গুরুর শিষ্য। মাঝেমধ্যেই তাঁর চেন্নাইয়ের আশ্রমে দুজনের দেখা সাক্ষাত্‍‌ও হয়।

 

সম্প্রতি মস্তিষ্কে ব্লাড ক্লট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর হৃত্বিক একটা কথাই বলেছিলেন… মনীষার ফাইটিং স্পিরিট তাঁকে এই সময়ে সাহস জোগাচ্ছে…

 

সাবাস মনীষা… নিজেকে নিঃশেষ করে নয়, আপনি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে স্বমহিমায় শুধু ফিরেই আসেননি, সাহস ও ভরসা জুগিয়েছেন বহু মানুষকে… দেখিয়ে দিয়েছেন জীবনকে ভালোবাসতে জানতে হয়… তাকে আগলে রাখতে শিখতে হয়…

Let us know whether you liked the post or not

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s